জামাই ষষ্ঠী: বাংলার এক মিষ্টি পারিবারিক উৎসব
জামাই ষষ্ঠী — নামটা শুনলেই মনে পড়ে জামাইয়ের মুখে হাসি, শাশুড়ির হাতে সাজানো রকমারি খাবার, আর এক গার্হস্থ্য-ভিত্তিক আনন্দঘন পরিবেশের কথা। এই উৎসবটি বাঙালি সংস্কৃতির একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পারিবারিক অনুষ্ঠান, যেখানে মেয়ের বাড়িতে জামাইকে রাজকীয় ভাবে আপ্যায়ন করা হয়। তবে শুধু খাওয়া-দাওয়া নয়, এর পিছনে আছে পুরনো লোকবিশ্বাস, পৌরাণিক কাহিনি এবং সামাজিক আবেগের এক গভীর মেলবন্ধন।
জামাই ষষ্ঠী কী?
জামাই ষষ্ঠী হল হিন্দু বাঙালিদের একটি জনপ্রিয় পার্বণ, যা জ্যৈষ্ঠ মাসের শুক্লপক্ষের ষষ্ঠী তিথিতে পালিত হয়। এই দিনটি মূলত মায়েদের জন্য ‘ষষ্ঠী দেবী’র ব্রত পালন করার দিন। কিন্তু জামাই ষষ্ঠী নামটা এসেছে কারণ এই দিনটিকে কেন্দ্র করে শাশুড়িরা তাঁদের জামাইদের নিমন্ত্রণ করে, খাওয়ান, আশীর্বাদ করেন ও উপহার দেন।
কেন পালিত হয় জামাই ষষ্ঠী?
জামাই ষষ্ঠীর মূল উদ্দেশ্য পরিবারে কল্যাণ, মেয়ের স্বামী তথা জামাইয়ের দীর্ঘায়ু ও মঙ্গল কামনা। শাশুড়ি ষষ্ঠী দেবীর কাছে প্রার্থনা করেন যেন তাঁদের কন্যার দাম্পত্য জীবন সুখী হয় এবং তাঁদের জামাই সুস্থ ও দীর্ঘজীবী হন। এটি একপ্রকার সামাজিক বন্ধনেরও প্রতিফলন — জামাইকে পরিবারের একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসাবে মেনে নেওয়া এবং সম্মান জানানোর উৎসব।
কীভাবে পালিত হয়?
জামাই ষষ্ঠীর দিন শুরু হয় সকালে ষষ্ঠী ব্রত পালন দিয়ে। মা ও শাশুড়িরা ষষ্ঠী দেবীর আরাধনা করেন, ফল-মিষ্টি নিবেদন করেন। এরপর জামাইয়ের আগমন ঘটে — সাধারণত শ্বশুরবাড়ি থেকে জামাইকে নিমন্ত্রণ করে নিয়ে আসা হয়। একে বলে "জামাই আনা"।
তারপর শুরু হয় আসল পর্ব — ভুরিভোজ। জামাইয়ের জন্য রান্না হয় ইলিশ মাছ, চিংড়ি, পোলাও, মাংস, লুচি, সন্দেশ, দই, আম, ও আরও কত কী! মাঝে মাঝে জামাইয়ের পাতে নিজের হাতে পরিবেশন করেন শাশুড়ি — একটা অদ্ভুত ভালোবাসার অনুভূতি থাকে এর মধ্যে।
অনেক জায়গায় জামাইয়ের হাতে উপহার হিসেবে নতুন জামাকাপড়, ঘড়ি, বা অন্য সামগ্রীও তুলে দেওয়া হয়। কোথাও কোথাও আবার ‘হাতের তালুতে চন্দন দিয়ে আশীর্বাদ’ দেওয়ার রীতিও রয়েছে।
জামাই ষষ্ঠীর ইতিহাস ও পৌরাণিক কাহিনি:
ষষ্ঠী দেবী সম্পর্কে একটি জনপ্রিয় কাহিনি প্রচলিত আছে। এক মহিলার ছয়টি সন্তান হয়েছিল, কিন্তু ষষ্ঠী দেবীকে না মানার কারণে তাঁর সব সন্তান মারা যায়। পরে তিনি ষষ্ঠী দেবীর আশ্রয় নেন এবং দেবী তাঁকে ক্ষমা করে সন্তানদের ফিরিয়ে দেন। এই থেকেই ষষ্ঠী ব্রত পালনের শুরু।
জামাই ষষ্ঠী ঠিক কবে থেকে শুরু হয়েছে তা নির্দিষ্টভাবে বলা কঠিন, তবে ধারণা করা হয় এটি শতাব্দীপ্রাচীন একটি প্রথা। প্রাথমিকভাবে এটি ছিল একেবারে গৃহস্থালি স্তরের পার্বণ, কিন্তু ধীরে ধীরে এটি সামাজিক গুরুত্ব পেতে শুরু করে।
আধুনিক প্রেক্ষাপটে জামাই ষষ্ঠী:
আজকের দিনে জামাই ষষ্ঠীর রূপ কিছুটা বদলেছে। এখন অনেকেই রেস্তোরাঁয় খেতে যান, অনেকে সোশ্যাল মিডিয়াতেও জামাই ষষ্ঠী সেলিব্রেশন শেয়ার করেন। তবে তার মূল ভাবনাটি একই আছে — সম্পর্ককে সময় দেওয়া, যত্ন নেওয়া, ও পারস্পরিক ভালোবাসা প্রকাশ করা।
জামাই ষষ্ঠী কেবল একটি অনুষ্ঠান নয়, এটি এক আবেগ, এক মায়ার বন্ধন। এটি প্রমাণ করে, সম্পর্কের যত্ন নিলে তা আরও বেশি গভীর ও অর্থবহ হয়ে ওঠে। এই উৎসব শুধুমাত্র জামাইয়ের নয় — এটি একটি পরিবারের মিলনের দিন।
তাই, যাঁদের বাড়িতে জামাই আছেন, তাঁরা প্রস্তুতি শুরু করে দিন। আর যাঁরা জামাই, তাঁরা তৈরি হন — কারণ জামাই ষষ্ঠী মানে শুধু পেটপুরে খাওয়া নয়, একরাশ ভালোবাসাও।
শুভ জামাই ষষ্ঠী!👑




Comments
Post a Comment